বিএনপির কর্মসূচি, কূটনৈতিক পাড়ায় হতাশা

বিএনপির কর্মসূচি, কূটনৈতিক পাড়ায় হতাশা

বিএনপিকে বারবার বিদেশি দূতাবাসগুলো বলেছিল শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দেওয়ার জন্য। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে জনসমর্থন বৃদ্ধি এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের একটি আবহ সৃষ্টির জন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ পশ্চিমা দেশগুলো শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে লড়াই করে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু বিএনপি কথা রাখেনি। আর এই কথা না রাখার কারণেই কূটনৈতিক মহলে এখন হতাশা চলছে। 

গত কয়েক বছর আস্তে আস্তে বিএনপি কূটনৈতিকদের আস্থা অর্জন করেছিল। বিশেষ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপির সঙ্গে তার একটা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ হয়েছিল এবং এই যোগাযোগের সূত্র ধরেই বিএনপি আস্তে আস্তে একটি জনভিত্তিক আন্দোলনের কর্মসূচির দিকে মনোনিবেশ করছিল। বিশেষ করে গত বছরে যখন তারা বিভিন্ন বিভাগীয় সমাবেশ করেছিল সেই বিভাগীয় সমাবেশ গুলো বিভিন্ন মহল কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছিল। এর ফলে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তিও আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পাচ্ছিল। 

অনেকেই মনে করেছিল যে বিএনপি এই শান্তিপূর্ণ পথেই এগোবে এবং শান্তিপূর্ণ পথে এগিয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। কিন্তু গতকাল বিএনপি যে কাজটা করেছে তা কূটনৈতিক অঙ্গনে একধরনের বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ বিভিন্ন দূতাবাসগুলোর সঙ্গে বিএনপি সার্বক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করতো। বিএনপির নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ড. আব্দুল মঈন খান, শামা ওবায়েদ এবং আরও কয়েকজন বিভিন্ন দূতাবাসের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন। তারা বিএনপিকে কোনো অবস্থাতেই যেন আন্দোলন সহিংস রূপ না নেয় সেই পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং সে ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাক নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দল যখন বাংলাদেশ সফর করে তখন তারা পরিষ্কারভাবে সহিংস রাজনীতিকে না বলে গিয়েছিল। বিএনপিও তাদেরকে কথা দিয়েছিল যে তারা কোনো অবস্থাতেই সহিংস পথে যাবে না। কিন্তু আন্দোলনের কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়াই এই ধরনের জ্বালা-পোড়াও, ভাঙচুরের ঘটনা কূটনৈতিকদেরকে বিস্মিত করেছে। বিশেষ করে প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলা এবং রাজারবাগ হাসপাতালে হামলার ঘটনা কূটনৈতিকদেরকে বিব্রত করেছে। বিএনপির ওপর তারা অনেকেই বিরক্ত। যদিও প্রকাশ্যে কোনো কূটনীতিকরা এইসব নিয়ে কথা বলেননি। 

গতকাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে সেই বিবৃতিতেও একটি নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সন্ত্রাস, অহিংসতা বন্ধের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। যারা এই ধরনের সহিংসতা করবে তাদের ওপর ভিসা নীতি প্রয়োগ করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। সুস্পষ্ট ভাবেই মনে হচ্ছে যে বিএনপি যে কর্মসূচি ঘোষণা করছে সেই কর্মসূচি সঙ্গে কূটনৈতিক মহল একমত নয়। তারা এধরনের সহিংস কর্মসূচিকে মোটেও পছন্দ করছেন না। এর ফলে গত কয়েক বছরের প্রাণন্ত চেষ্টার পর বিএনপি কূটনৈতিক মহলে যে আস্থা অর্জন করেছিল সেই আস্থায় চির ধরেছে। অনেক বিদেশি দূতাবাস গুলো মনে করছে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। এই সম্পর্কের কারণেই এখন বিএনপি জামায়াতের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে এবং এ ধরনের জ্বালাও-পোড়াও সহিংস রাজনীতি করছে। এই রাজনীতি কখনোই ইতিবাচক ফলাফল দেবে না বলে কূটনৈতিকরা মনে করছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া সহ বাংলাদেশে যে সমস্ত দূতাবাসগুলো প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে তারা কেউই বিএনপির এই অবরোধ, হরতালের কর্মসূচিকে সমর্থন করছে না। বরং এর ফলে জনজীবনে অস্থিরতা এবং সহিংসতা বৃদ্ধি পাবে বলেই তারা মনে করছেন। এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিকদের সমর্থন হারাতে পারে বিএনপি। আর এরকম সমর্থন হারালে বিএনপির আন্দোলন যে মুখ থুবড়ে পড়বে তা বলাই যায়।