দুই বছর বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত পিয়ন, বেতন দিচ্ছেন প্রধান শিক্ষক

প্রায় বছর দুয়েক ধরে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত অফিস সহায়ক। অথচ আর তাকে হাজিরা খাতায় নিয়মিত দেখিয়ে বেতনভাতা দিচ্ছেন প্রধান শিক্ষক। অনিয়মের এমন অভিযোগ উঠেছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বৃক্ষরোপণে জাতীয় শ্রেষ্ঠ পুরস্কারপ্রাপ্ত জহুরুল হাট হাজি এলাহী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে গেল ১২ নভেম্বর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর একটি অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন বিজয় চৌধুরী নামে এক অভিভাবক।
কিন্তু সরেজমিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে জানা যায়, অভিযোগের সঙ্গে মিল নেই বাস্তব চিত্রের। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বছর কয়েক আগে বিভিন্নজনের নিকট সুদে টাকা ধার নিয়েছিলেন অফিস সহায়ক (পিয়ন) সুকুমার চন্দ্র সরকার। পরে লাভের টাকা নিয়মিত পরিশোধ করতে গিয়ে একের পর এক গ্রাম্য মহাজনের ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি। ধীরে ধীরে লাভের অংকটা বেশি হওয়ায় তা আর চালাতে পারছিলেন না সুকুমার। তাই তো দুই মেয়েকে ফেলে বিনাবেতনে ছুটি নিয়ে রাতের আঁধারে বাড়ি ছাড়তে হয় সুকুমারকে।
সুকুমারের ওপর কোনো ক্ষোভ না থাকলেও আগামীতে নিয়োগ রয়েছে বলে ওই অভিযোগ করা হয়েছে— এমনটিই জানিয়েছেন স্থানীয়দের অনেকেই।
অভিযোগকারী বিজয় চৌধুরী বলেন, বিভিন্নজনের কাছ থেকে সুকুমার সুদে টাকা ধার নিয়েছিলেন। দিতে না পেরে এক দেড় বছর থেকে উধাও হয় সে। হেডমাস্টার বেতন দিচ্ছেন। কিন্তু কীভাবে দিচ্ছেন, কেন দিচ্ছেন তা জানা নেই আমাদের। অথচ বিজয় চৌধুরী তার লিখিত অভিযোগে বলেছেন— সুকুমারের বিদ্যালয়ে দুই বছরের বেশি সময় ধরে অনুপস্থিত আছেন। এতে তার অভিযোগ ও গণমাধ্যমকর্মীকে দেওয়া বক্তব্যের মধ্যে গরমিল দেখা যায়।
স্থানীয় সোহেল নামে অপর এক অভিযোগকারী বলছেন, সুকুমার এক-দেড় বছর ধরে স্কুলে আসেন না। কিন্তু নিয়মিত তার বেতনভাতা তোলা হচ্ছে। এ বিষয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর আমরা একটা লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।
এদিকে সুকুমারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। একাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট মেয়েটিই থাকে সেখানে। বড় মেয়েটি পড়ছে কোনো এক বেসরকারি নার্সিং কলেজে। জানা গেল, মেয়েটিকে খাওয়ানোর দায়িত্ব নিয়েছেন পাশের বাড়ির সুকুমারের ছোট ভাই স্বপন কুমার। ঋণের কারণে বাবার লুকিয়ে থাকার কথা বলেই দু’চোখ পানিতে ছল ছল করে ওঠে কলেজ পড়ুয়া মেয়েটির।
সুকুমারের ভাই স্বপন কুমার বলেন, সুদের টাকার চাপে বাড়িতে থাকতে পারে না তার ভাই। লুকিয়ে লুকিয়ে ডিউটি করতে হয় তাকে। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো মেয়ে দুটোর পড়াশোনা করা হবে না আর। এ বিষয়ে প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন তিনি।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে সুকুমারের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, স্কুলে এসে সুদে কারবারিরা প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এ জন্য হেড স্যার ও কমিটিকে বলে রাতের ডিউটি নিয়েছি। আর দিনে ডিউটি করে নাইটগার্ড। এভাবে পালিয়ে থাকতে না পেরে গত ২৫ অক্টোবর আমি বিনাবেতনে ছুটি নিয়েছি।
এ ব্যাপারে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহুরুল ইসলাম বাদশা জানান, সুদে ধার নেওয়া টাকা শোধ করতে না পারায় পাওনাদাররা মাঝেমধ্যে স্কুলে এসে হুমকি দেওয়ায় তার নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে গেল বছরের ৭ নভেম্বর রেজ্যুলেশনের মাধ্যমে সুকুমারকে রাতের ডিউটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সেই থেকে সুকুমার নিয়মিত রাতের বেলা স্কুলে থাকে। হাজিরা খাতা ও বেতন বিলে সই, স্বাক্ষর সে নিজেই করে। গত ২৫ অক্টোবর বিনাবেতনে ছুটির আবেদন দিয়েছে সে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল মমিন মণ্ডল বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে জানতে চেয়েছি। জবাব পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে গ্রাম্য মহাজনের ঋণের কারণে লুকিয়ে থাকা সুকুমার যেন চাপমুক্ত থেকে স্কুলে এসে দায়িত্ব পালন করতে পারেন এবং একই সঙ্গে বৃক্ষরোপণে জাতীয় শ্রেষ্ঠ পুরস্কারপ্রাপ্ত বিদ্যালয়টির সুনাম যাতে অক্ষুণ্ন থাকে, সে জন্য কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবেন বলে প্রত্যাশা করে এলাকাবাসী।