প্রসঙ্গ হিরো আলম: নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারছে আওয়ামী লীগ?
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সর্বোচ্চ পাঁচ মাস বাকি। বর্তমান সরকারের মেয়াদ আছে খুব বেশি হলে দুই মাস। এর পর গঠিত হবে নির্বাচনকালীন সরকার। এরই মধ্যে ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় আজ ১৭ জুলাই (সোমবার)। ঢাকা-১৭ আসনের সংসদ সদস্য আকবর হোসেন পাঠানের (চিত্রনায়ক ফারুক) মৃত্যুর পর এই সংসদীয় আসনটি শূন্য হয়। পরে ১৭ জুলাই এই আসনের উপনির্বাচন দিবসের তারিখ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এই নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হয়েছেন মোহাম্মদ এ অরাফাত এবং একতারা প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন হিরো আলম খ্যাত ইউটিউবার আশরাফুল আলম। তাই এই উপনির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতুহলের সীমা নেই।
এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র পাঁচ মাস আগে ঢাকা-১৭ আসনটির জয় যেমন আওয়ামী লীগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হওয়া এবং এই নির্বাচন নিয়ে যেন কোনো ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি না হয়। এই নির্বাচনে একদিকে যেমন আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা নির্ভর করে, অন্যদিকে নির্বাচনে যেন কোনো ধরনের হট্টগোল, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়- সেটিও বিবেচ্য বিষয়। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী মহল থেকে তৃণমূল পর্যায়ে এই ধরনের দিক নির্দেশনা দেয়া আছে বলে আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।
অন্যদিকে এই সময়ে ঢাকায় অবস্থান করছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রাক নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দল। ইইউ প্রাক নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলের ২ সদস্য শনিবার (৮ জুলাই) সন্ধ্যায় ঢাকায় এসেছেন। পরের দিন রোববার (৯ জুলাই) ভোরে ইইউ প্রাক নির্বাচনী প্রতিনিধি দলের নেতা রিকার্ডো শেলেরি রিকার্ডোসহ আরও চার সদস্য ঢাকায় পৌঁছান। আগামী ২৩ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করবেন ছয় সদস্যের ইইউ প্রতিনিধি দলটি। ইইউ প্রতিনিধি দলটি বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। তারা সম্ভাব্য নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের কর্মপরিধি, পরিকল্পনা, বাজেট, লজিস্টিকস ও নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়গুলো মূল্যায়ন করবেন।
এই পরিস্থিতির মধ্যে ঢাকা-১৭ আসনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু অতি উৎসাহী ব্যক্তি হিরো আলম খ্যাত ইউটিউবার আশরাফুল আলমের উপর চড়াও হয়েছেন। তারা হিরো আলমকে মারধর করেছেন, ধাওয়া দিয়েছেন- যার ভিডিও ইতিমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। এই ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন জন বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। চায়ের দোকান থেকে রাজনৈতিক অঙ্গন, সবখানেই আলোচনায় ওঠে এসেছে হিরো আলমকে মারধরের ঘটনাটি। কেউ হিরো আলমের প্রতি দয়া দেখাচ্ছেন এবং বলছেন, এই কাজটি করা আওয়ামী লীগের লোকদের ঠিক হয়নি। আবার কেউ বলছেন, বগুড়াতে নির্বাচন করাটাই হিরো আলমের জন্য ভালো ছিল, গুলশানে নির্বাচনে আসাটা তার ঠিক হয়নি। অন্যদিকে বোদ্ধা মহল মনে করছেন, ইইউ প্রাক নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলের উপস্থিতিতে এ ধরনের ঘটনা আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে।
গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ভোটকেন্দ্রের ভেতর থেকে ধাওয়া দিয়ে বাইরে আনার পরে রাস্তায় ফেলে ঢাকা-১৭ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী আশরাফুল আলম ওরফে হিরো আলমকে পিটিয়েছেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর সমর্থকেরা। হামলাকারীরা নৌকা প্রতীকের ব্যাজ পরে ছিলেন। সোমবার (১৭ জুলাই) বেলা সোয়া তিনটার দিকে রাজধানীর বনানী এলাকার বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে হিরো আলমের ওপর এ হামলা হয়। মারধর থেকে বাঁচতে এক পর্যায়ে হিরো আলম দৌড়ে পালান। হামলাকারীরা এ সময় তাঁকে পেছন থেকে ধাওয়া দেন। হিরো আলম এক পর্যায়ে বনানীর ২৩ নম্বর সড়কে গিয়ে একটি রিকশায় ওঠেন। পরে গাড়িতে করে চলে যান। পরে আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন হিরো আলম।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ঢাকা-১৭ আসনের নির্বাচন দিবসে বেলা তিনটার দিকে বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়েছিলেন হিরো আলম। সেখানে তিনি একটি নারী ভোটকেন্দ্রে যান। এ সময় নৌকা প্রতীকের কর্মী ও সমর্থকেরা পেছন থেকে হিরো আলমকে গালমন্দ করতে থাকেন এবং কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে চলে যেতে বলেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে কেন্দ্রটির দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা হিরো আলমকে ঘিরে রেখে স্কুলের ফটকের দিকে নিয়ে যান। তখনো পিছু নেন হামলাকারীরা। স্কুলের প্রাঙ্গণ থেকে বেরুনোর পরে হিরো আলমের পাশে পুলিশ সদস্যরা ছিলেন না। স্কুল থেকে বের হয়ে ফটকের সামনে দিয়ে সোজা ১৬ নম্বর সড়কের দিকে দ্রুত এগোতে থাকেন হিরো আলম। এক পর্যায়ে দলীয় নেতা–কর্মীরা হিরো আলমকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেন, তখন তাঁকে এলোপাতাড়ি তাঁরা মারধর করেন। হিরো আলমের সঙ্গীরা তাঁকে রক্ষা করে সামনের দিকে নিয়ে গেলে ২৩ নম্বর সড়কের ব্লক এ পর্যন্ত তাঁকে পেছন থেকে ধাওয়া করা হয়।
হিরো আলমের উদ্দেশে উত্তেজিত নেতা–কর্মীদের বলতে শোনা যায়, ‘সে করে টিকটক, সে হলো জোকার, সে কেন গুলশান-বনানীর এমপি হতে চায়? এমপির মানে সে জানে?’কেউ কেউ আবার বলছিলেন, ‘তারে খালি দৌড়ানি দে, মারধর করা লাগব না।’
হিরো আলম চলে যাওয়ার পর পুলিশ তাঁকে মারধরকারীদের একজনকে আটক করে।
সূত্র জানায়, গুলশান-১৭ আসনের উপনির্বাচনকে বিতর্কিত করতে সরকার বিরোধীরা ওৎ পেতে রয়েছে। তারাই উস্কানি দিয়ে, অর্থ দিয়ে হিরো আলমকে এই আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী করেছে। এ ঘটনায় তারা একটি ইস্যু পেয়েছে। এখন এই ইস্যুটিকে কেন্দ্র করেই তারা ঢাকায় অবস্থারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাক নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দলের কাছে নালিশ করতে পারবে, তারা বলতে পারবে যে- এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়। এই সরকারের সন্ত্রাসী বাহিনী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকেও মারধর করতে ছাড় দেয় না। ফলে দ্বাদশ নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে পারে। এর জন্য কঠিন মূল্য দিতে হবে আওয়ামী লীগকে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ব্যাজ পরা কারা এরা? বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনকে বিতর্কিত করতেই কি তারা পরিকল্পিভাবে এটি করেছে? এরা কি সত্যিই আওয়ামী লীগের লোক, নাকি আওয়ামী লীগকে বিতর্কিত করতেই আওয়ামী লীগের মুখোশধারী ব্যক্তিরা এ ধরনের একটি অনভিপ্রেত কান্ড ঘটিয়েছে? - এই প্রশ্নগুলো এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।



