আধিপত্যবাদের এই যুদ্ধের শেষ কোথায়

আধিপত্যবাদের এই যুদ্ধের শেষ কোথায়

বিশ্বকে একটা পর দুর্যোগ দেখতে হচ্ছে। করোনা সংকটের রেশ কাটতে না কাটতেই মুখোমুখি হতে হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহতার সঙ্গে। এই যুদ্ধ পরিস্থিতি দুই বছরের পা দিয়েছে শুক্রবার (২৪ ফেব্রুয়ারি)।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে ২০২২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ইউক্রেনে হামলা করা হয়। যুদ্ধে ইউক্রেন তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এখনও লড়ে যাচ্ছে দেশটির বাহিনী। এদিকে, যুদ্ধ এ দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়েছে। রাশিয়ার পক্ষে চীন ছাড়াও উত্তর কোরিয়া, ইরান ও বেলারুশ থাকলেও ইউক্রেনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে আরেক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ। এমনি এক বাস্তবতায় দিন পার করছে পুরো বিশ্ব।

দুই দেশের যুদ্ধ চললেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে ‘আগ্রাসনের’ অভিযোগ। রাশিয়ার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নিন্দা প্রস্তাব সহ পক্ষে-বিপক্ষে ভোটাভুটি পর্যন্ত হয়েছে। পক্ষ-বিপক্ষের অবস্থান নির্ণয়ে এই সংস্থাভুক্ত বেশিরভাগ দেশই রাশিয়ার ‍বিপক্ষে ভোট দিয়েছে।

যুদ্ধে প্রাণহানির বিষয়ে জাতিসংঘ বলছে, মোট ৭ হাজার ১৯৯ জন বেসামরিক লোক মারা গেছেন। আহত হয়েছেন অসংখ্য। এছাড়া বাড়ি ছাড়া হয়েছে লাখ লাখ মানুষ।

সবশেষ কে কতটুকু এগিয়ে গেল

যুদ্ধ পরিস্থিতির ৩৬৫ দিন পর ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণে বেশ কিছু জায়গা দখল করে নিয়েছে রাশিয়া। কিয়েভ ও খারকিভ আক্রমণ করে দখলে নিতে ব্যর্থ হলেও খেরসন ঠিকই নিজেদের করায়ত্বে নেয়। এছাড়া পূর্ব ইউক্রেনের বাখমুত ও আশেপাশে সংগঠিত যুদ্ধে সফল হয়েছে রুশরা।

দক্ষিণাঞ্চলের খেরসন প্রদেশের রাজধানী কিয়েভ দখল নিতে না পারলেও ডনিপ্রো নদীর পূর্ব দিক রাশিয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

ইইক্রেনীয় শরনার্থীরা কোথায় আশ্রয় নিয়েছে?

যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে হাজার হাজার ইইক্রেনীয়রা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

জাতিসংঘের হিসেব মতে, যুদ্ধ শুরুর এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৮৬ লাখ ইউক্রেনীয়রা দেশ ছেড়েছে। এ মধ্যে বেশিরভাগই পার্শ্ববর্তী দেশ পোল্যান্ডে অবস্থান নিয়েছে। এছাড়াও রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও কয়েকটি দেশে শরনার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে ইউক্রেনীয়রা।

ন্যাটো কার পক্ষে?

পৃথিবীর বৃহৎ সামরিক জোট ন্যাটো। তারা ইউক্রেনের পক্ষ নিয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিলেও অস্ত্র, সামরিক প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে দেশটিকে।

সামরিক শক্তির দিক থেকে পঞ্চম অবস্থানে থাকা রাশিয়া এই যুদ্ধ শুরুর আগে সেনা সদস্য চিল ৯ লাখ এবং ইউক্রেনের ২ লাখ ৯ হাজার।

সবশেষ বৃহস্পতিবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাজে্যর প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস দাবি করেছেন, গত ১২ মাসে রাশিয়া ১ লাখ ৮৮ হাজার সেনা হারিয়েছে।

এক বছরে জয়-পরাজয়

রাশিয়া প্রথম থেকেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ দখল করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে ডনবাসের দিকে মনোযোগী হয়। এ অঞ্চলের বেশিরভাগ জায়গা দখলে নেয় রুশ বাহিনী। অন্যদিকে ইউক্রেনীয় বাহিনী দেশটি থেকে রুশ বাহিনী তাড়াতে চাইলেও এখনও সফল হয়নি। রাশিয়া এদিক থেকে কিছুটা এগিয়ে থাকলেও তাদের লক্ষ্য পুরোপুরি সফল হয়নি। সে হিসেবে বলা যায়, কোনো দেশই তাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি।

সমাধানের পথ কোথায়?

যুদ্ধ বন্ধে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি দেশ দুটি। তাদের মিত্ররাও এই যুদ্ধ বন্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বরং ইউক্রেনের মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ডলার ও অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করেছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থকারী হিসেবে চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু তা সফলতার মুখ দেখেনি। এর আগে অবশ্য চীনও এমন একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু সেটি ব্যর্থ হয়।

রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে বছরব্যাপি এ যুদ্ধ না বন্ধ হওয়ার কারণে পুরো বিশ্ব নানাবিধ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে যে প্রধান দুটি সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্ব সেগুলো হলো, জ্বালানি ও খাদ্য। এই দুটি সমস্যা জর্জরিত পুরো বিশ্ব। নিজেদের শক্তিমত্তা জাহির করতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপী ইউনিয়ন একদিকে যেমন ইউক্রেনকে সহযোগিতা করে চলেছে। অন্যদিকে রাশিয়া তার মিত্রদের নিয়ে লড়াই অব্যাহত রেখেছে এবং দিনকে দিন তা আরও তীব্র হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন রাশিয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের দেশগুলোর জন্য যেন ব্যক্তিত্বে লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। অহমিকার এই লড়াইয়ের বলি হচ্ছে বিশ্বের সাধারণ অর্থাৎ তৃতীয় বিশ্বের লোকজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অচিরেই এই যুদ্ধ বন্ধ না হলে বড় ধরণের ক্ষতির শিকার হবে পুরো বিশ্ব।